একটি স্বপ্ন পূরণের গল্প

Categories Uncategorized
সাইকেল চালানো শুরু করেছিলাম বিডিসাইক্লিস্টস এর হাত ধরেই ২০১১ এর শেষ দিকে। মুলত ঢাকার জ্যাম থেকে বাচাটাই ছিল উদ্দেশ্য ,আর পকেটের পয়সা বাচানোর জন্য!
টুকটাক রাইডে এটেন্ড করতাম ,বন্ধু বান্ধব হতে লাগল নতুন নতুন, অনেক দারুন কিছু বড় ভাই।মডারেটর,এডমিন রা সব সময় সাইকেল চালানোতে উৎসাহ দিত।
বসিলা বেরাইদ আর ক্ষিলখেত এর পেছনের গ্রাম গুলো ছিল শুক্র শনিবারের সাইকেল নিয়ে যাওয়ার জায়গা। একটা নতুন জীবনের সুচনা।
হুট করেই টিওবি( ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশ) ২০১২ এর ফেব্রুয়ারীতে তাদের ইতিহাসে প্রথম কোন সাইকেল টুরের আয়োজন করে। যাতে যাচ্ছেন আমার গুরু শরীফ ভাই ,যিনি ২০১০ এ সাইকেলে এক ট্রিপে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ঘুরে এসেছেন। আমি ও সাহস সঞ্চয় করে টাকা জমা দিয়ে তাদের সাথে চলে যাই। শ্রীমংগল এর ওই ২ দিনে ১০০ কিলোর রাইড টা আমাকে একদম নতুন করে দেশ চেনালো। আমি এক নতুন আমিতে আবিষ্কার করলাম নিজেকে। মনে হলো সাইকেল এর দামটা ওই এক টুরেই উসুল!
ঘুরে বেড়াতাম কাজে অকাজে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু অন্য বাহনে। সাইকেল নামক বাহন টা এক নতুন দিগন্ত যোগ করল ঘোরাঘুরিতে। যেখানে অনেক বেশী স্বাধীনতা, আমার কাছে মুক্তির এক নতুন সংজ্ঞা দাড়ালো সাইকেল এ ঘুরে বেড়ানো।
দিনে গিয়ে দিনে ফেরার রাইডে অনেক সংগী সাথি পাওয়া গেলেও লং রাইড বা কয়েক দিন সাইকেল নিয়ে বাইরে থাকার মানুষ খুব ই অপ্রতুল। এখন ও এই ব্যাপার টা সত্য। আর ২০১২-১৩ এর দিকের অবস্থাটা একটু ভাবুন!
প্রথম ক্রস কান্ট্রি টা করলাম ২০১৩ এর মাঝামাঝি । সাতক্ষিরা থেকে তামাবিল।সংগী সেই গুরু শরীফ ভাই আর লিপু। শরীফ ভাই এর সাথে ৬ দিন সাইকেল চালিয়েই শিখলাম অনেক কিছু। লম্বা রাস্তায় টিকে থাকার কলা কৌশল। আমি তখন ছিলাম চঞ্চল, উত্তেজিত চালক! কিন্তু শরীফ ভাই রাগতেন না। হাসি মুখে শিখাতেন ,বুঝাতেন। আমি ও সিনিয়র হওয়ার পর চেস্টা করি তার পদাঙ্ক অনুসরন করতে ,যদিও সব সময় পারি না! আমার ধৈর্য্য বড্ড কম!
ক্রস কান্ট্রি বা দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চালানোর ভুত টা ওই ট্রিপে ঢুকে গেলো। যেখানে অনেকেই জীবনে একটা ক্রস কান্ট্রি দিয়ে বাকী জীবন তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আর স্মৃতির জাবর কেটে কাটাতে পারে ।কিন্তু আমি যেনো ক্ষুদার্ত ,আর ও দেখতে চাই ,আর ও জানতে চাই, আর ও দূরে দূরে সাইকেল চালাতে চাই।
২০১৩ এর শেষ দিকে আবার বের হবো হবো করছি ,আর কাউকে খুজছি ।এমন সময় পরিচয় হলো হিমেল নামে এক জুনিয়র এর সাথে। যে কখনো সাইকেল নিয়ে ঢাকার বাইরে যায় নি, কারো সাথে রাইডেও যায় না। কিন্তু সাইকেল কিনেছেই দেশ দেখার জন্য ! পারফেক্ট! তাকে নিয়ে একটা ট্রায়াল রাইডে বের হলাম, ঢাকা- মানিকগঞ্জ- পাবনা-কুস্টিয়া-রাজবাড়ি- মানিকগঞ্জ – ঢাকা। ফেরার দিন এত বেশী চালানো লেগেছিল যে ,হাইওয়েতে সাইকেল চালাতে চালাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কয়েকবার!! বেচে ফিরেছিলাম কপাল গুনে। হিমেল এক ট্রিপেই পাশ। দারুন চালালো, বয়সে অল্প হলেও ধৈর্য্যশীল। মানাতে পারে যে কোন পরিস্থিতিতে। যা লং ডিস্টেন্স রাইডিং এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী জরুরী। আমি ভাগ্যবান সব ট্রিপেই দারুন সফর সঙ্গী পেয়ে এসছি আজীবন।
সপ্তাহ খানেক পর জিসান নামে একজনের সাথে ঢাকা –কুমিল্লা-চাদপুর-ঢাকা একটা রাইড দিয়ে এলাম।হরতাল অবরোধ থামছেই না দেখে হিমেল কে নিয়ে এক দারুন সার্কিট ট্রিপ দিলাম ডিসেম্বরে। রুট টা ছিল এমন –
ঢাকা- মধুপুর- রৌমারী-ঝিনাইগাতি-বিরিশিরি-সুনামগঞ্জ-সিলেট-জকিগঞ্জ-শ্রীমংগল-ঢাকা।
১২০০ কিলোর বেশী চালালাম ১০ দিনে। অর্ধেক এর বেশী উত্তরের বর্ডার লাইন ধরে। আজ যেই নিয়াজ মোর্শেদকে সবাই চেনে লং ডিস্টেন্স ট্যুরার হিসেবে তার পরিচয়টা এই সফরে পাকাপোক্ত হয়।
এখনও অনেকে এই রুটে সাইকেল চালিয়ে যায়, আর তৃপ্তি নিয়ে ফিরে আসে। ক্লান্তিহীন সেই যাত্রা।
২০১৪ এর জানুয়ারী তে ট্রেকার্স অফ বাংলাদেশ গ্রুপের সাথে চলে গেলাম বান্দরবান।সাইকেল চালিয়ে নেমে এলাম কেওক্রাডং থেকে। সে এক দারুন রোমাঞ্চকর ট্রিপ ছিল। সবাই ঢাকা ফিরে এলেও আমি ২ দিন চিটাগাং এ বিশ্রাম নিয়ে নতুন ক্রস কান্ট্রির জন্য চালালাম বন্দর থেকে বন্দরে। চিটাগাং এর রিফাতকে সঙ্গে নিয়ে চিটাগাং- লক্ষীপুর- বরিশাল-মোড়েলগঞ্জ- মংলা- বাগেরহাট রুটে উপকুল আর সুন্দরবন ঘেষে ছিল সেই ট্রেইল। আফসোস এখনো সাতক্ষীরা পর্যন্ত যেতে পারি নি, বাসা থেকে ফেরার চাপ আসায়। তবে কোন এক দিন হয়ত আবার যাবো। সেই ভয়ংকর খারাপ রাস্তা দিয়ে সুন্দরবন কে পাশে রেখে,যে পথে গিয়েছিলেন অগ্রজ রাহাত ভাই,শরীফ ভাই, শাওন ভাইরা।
রাহাত ভাই একটা পোস্ট করেছিল আমার এই সব দূর দুরান্ত যাত্রা নিয়ে বিডিসাইক্লিস্টস এ। আনন্দের সাথে সাথে দায়িত্ববোধ ও বেড়ে গেলো অনেকখানি। আর ও নতুন ক্রস কান্ট্রি আর আনাচে কানাচে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর নতুনদের উৎসাহী করার তাগিদ ছিল ওই লেখনী। অভিনন্দনের জোয়ারে সাইকেল সমেত ভেসে না যাই!
আমি ভাসি নি, কিছু মাস বিরতি দিয়ে নতুন একটা সাইকেল কিনলাম ২০১৪ এর রোজায়। সারাসেন ক্রস টু। এত দিনের ট্যুর ছিল সব মাউন্টেন বাইক নিয়ে।যা মুলত আমার কর্মকান্ডের সাথে যায় না। মানছি এটা পুরোদস্তুর টুরিং বাইক না, কিন্তু ওই সময়ে সাধ্যের মাঝে সেরা টুরিং বাইক ছিল তা। যা দিয়ে এখনও টুর করে বেড়াই। এই সাইকেল কিনার পরের ট্রিপ গুলো আর ও বড় ও ঘন ঘন ঘটতে লাগলো। ৪ টা সাইকেল পালটিয়ে এই সাইকেলে থিতু হলাম। গতির সাথে স্বাচ্ছন্দ্য ও এলো। ব্যাগ বোচকা সাইকেলেই বেধে নিতে লাগলাম।
একটা ঝটিকা সফর দিয়ে এলাম রোজার ঈদের পর পর ই। ঢাকা- ভালুকা- মুক্তাগাছা- মধুপুর- সখিপুর- চন্দ্রা –ঢাকা। ২ দিনে। সাইকেলটার সাথে পুরোপুরি এডজাস্ট হলাম।
কোরবানীর ঈদ বাইরে করার অভিপ্রায়ে আমি ,শরীফ ভাই, মোহাম্মদ রওনা দিলাম পাহাড়ের দিকে। ফেনী পার হয়ে খাগড়াছরির শুরু থেকে সাইকেল চালালাম সাজেক এর উদ্দেশ্যে। একটা দুর্ঘটনা ঘটায় পুরোটা চালাতে পারি নি। আর ঈদের দিন মারিশ্যায় না খেয়ে থাকাটা ছিল দুঃখের মাঝেও হাসি পাওয়া অভিজ্ঞতা!
২০১৪ এর ডিসেম্বরে বেনাপোল চলে গেলাম। সাথে হিমেল আর রুমু। ইচ্ছে বর্ডার লাইন ধরে দক্ষিন থেকে উত্তর বঙ্গ একটা ক্রস কান্ট্রি দেয়ার। বেনাপোল-মুজিবনগর-চারঘাট-চাপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ-সাপাহার –নওগায় গিয়ে শেষ হলো ওই ট্রিপ। কুস্টিয়া আর ভারতের মাঝে পদ্মার এক চর ধরে রাত ১২ টায় সাইকেল চালিয়ে পার হওয়া ছিল সাংঘাতিক এক চ্যালেঞ্জ! হলো না পঞ্চগড় অব্দি যাওয়া এক ব্যবসার কাজে। ফিরে এলাম পরে কখনো আবার ওই রুটে চালাবো সংকল্প নিয়ে।
২০১৫ এর জানুয়ারী। উত্তরবঙ্গের শীত কেমন হয় দেখতে আমি আর নোমান ভাই রওনা দিলাম। রুট ছিল এমন , ঢাকা-ভুয়াপুর-শেরপুর-রাজীবপুর-চিলমারী-নাগেশ্বরী-পাটগ্রাম-দেবীগঞ্জ-বাংলাবান্ধা। উত্তরের সেই ডাকে ছুয়ে দিলাম ৩ স্থল বন্দরের সীমানা (ভুরুঙ্গামারি,বুড়িমারী,বাংলাবান্ধা) উফফ! কি ভয়ংকর শীত ওই অঞ্চলগুলোতে। হরতাল অবরোধে কিচ্ছু চলছে না,এক কয়লা বোঝাই ট্রাকে সাইকেল বেধে ফিরেছিলাম।
২০১৫ এর মার্চ। স্বপ্নের তেতুলিয়া-টেকনাফ ক্রস কান্ট্রি। একটু ভিন্ন আমেজ আনতে চ্যাম্পিয়ন নাহিদ ভাই এর ট্যান্ডেম টা ধার নিলাম।এ কাজে সহায়তা দিল সাইকেল লাইফ এক্সক্লুসিভের তৎকালীন কর্মকর্তারা। তাদের ঋন শোধ দেবার নয়।দিনাজপুর থেকে ট্যান্ডেম নিলাম ,সাথে আমার সাইকেল ও। হিমেল,রিফাত আর আমি ৩ জন ২ সাইকেলে পাড়ি জমালাম প্রথম বারের মত বাংলাদেশে ট্যান্ডেম দিয়ে কোন ক্রস কান্ট্রি তে। রুট টাও ছিল সবার করা থেকে ভিন্ন।
বাংলাবান্ধা-নীলফামারী-হিলি-মইন্নার চর-ময়মনসিংহ-ভৈরব-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম-চকরিয়া-টেকনাফ।
গাইবান্ধা আর জামালপুরের মাঝে যমুনার এক চরে মাঝির বাড়িতে কাটানো রাত সারা জীবনেও ভুলব না।
ফেরার পর একটা সাইকেল কোম্পানী (মাস্টার হুইলস) তাদের একটা নতুন ব্রান্ডের সাইকেল মাস্ট্যাং উপহার স্বরুপ দিল। যেদিন দিলো সেদিন রাতেই চালিয়ে চলে গেলাম আর ও ১০ জন সহ সিলেটের দিকে।
কোনদিন কুয়াকাটা যাই নি শুনে বন্ধু জিসান আর এক ছোট ভাই ইয়াসির সহ চলে গেলাম বরিশাল। সেখান থেকে চালিয়ে কুয়াকাটা। ফেরার পথে বরগুনা ঘুরে আবার পটুয়াখালী।
বরিশাল বিভাগ সাইকেল চালাতে সব সময় ই আমাকে টানে। ২ মাস পর আবার বরিশাল থেকে চালিয়ে গেলাম একেবারে সমুদ্রের ধারের পাথরঘাটায়। আনকমন এক রুট ধরে ৩ টা নদী অতিক্রম করে আবার কুয়াকাটা! জীবনে যাই নি যেখানে ,সেখানে এক বছরেই ২ বার।তাও সাইকেলে!
২০১৫ এর শেষ দিকে ২ টা অভিনব ক্রস কান্ট্রির ছক করলাম। যা করলে দাড়াবে মানচিত্রের উপর একটা (+) সাইনের মত। নতুন সাথী হাসীব ভাই, আপাদমস্তক চাকুরে,সংসারী লোক! কিন্তু একটা ক্রস কান্ট্রি করার জন্য মরিয়া হয়ে ছিলেন বছর খানেক। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত থেকে যাত্রা করে এক রাত ত্রিশাল। ২য় রাত ঢাকা ,নিজ বাসা!, ৩য় রাত মাওয়া ক্রস করে মাদারীপুরের শিবচর, ৪র্থ রাত শরীয়তপুরের ভিতর দিয়ে মুলাদী হয়ে বরিশাল। ৫ম রাত পটুয়াখালীর গলাচিপা, ৬ষ্ঠ রাত রাঙ্গাবালির সমুদ্র সৈকতে প্রথম ভাগের ক্রস শেষ করে মৌডুবি তে সাইক্লিস্ট ছোট ভাই শাওনের গ্রামের বাড়ি। যেখানে সে কোনদিন যায় নি! পরদিন লঞ্চে করে চাদপুর। সেখান থেকে চালিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত। যেখান থেকে পুব থেকে পশ্চিমে ২য় ক্রস শুরু হবে। আর ও ২ জন যুক্ত হলো।শাহাদাত ভাই আর সাভারের অনিক। আখাউড়া থেকে এক দিনে ঢাকা,আবার নিজের বাসাতেই ট্রিপের মাঝে রাত্রি যাপন! হাসীব ভাই চাকরী ও বাড়ি সামলাতে না পেরে আর গেলেন না,সাথে অনিক ও রয়ে গেলো। আবার ও ২ জন! আমি শাহাদাত ভাই। ঢাকা-রাজবাড়ি-কুস্টিয়া-মেহেরপুর-মুজিবনগরে গিয়ে শেষ করলাম পুব থেকে পশ্চিমের ২য় ভাগের ক্রস। হয়ে গেলো “প্লাস ক্রস কান্ট্রি”!
একটা চ্যারিটি রাইডে অংশ নিতে মালয়শিয়া যাওয়ার ডাক পরল। আমার আর নাহিদ ভাই এর। কিন্তু চালাতে হবে অনেক ৪ দিনে ১০০০ কিলো,তাও আবার রোড বাইকে। সি এল ই রোড বাইক দিয়ে সাহায্য করল। এখন আবার প্র্যাকটিস এর পালা। ঢাকায় থেকে কি ই বা প্র্যাকটিস হবে? তাই সাইকেল বেধে আমারটা নিয়ন ভাই কে দিয়ে আর নতুন বাহন রোড বাইক নিয়ে চলে গেলাম সিলেট। ২ দিন সময় নিলাম এই উড়ন্ত সাইকেল এর সাথে খাপ খাওয়াতে। চলতে লাগল সিলেট-মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ রুটে প্র্যাকটিস। কিন্তু যার মনে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছে, সে কি এক ই জায়গায় প্রতিদিন সাইকেল নিয়ে ঘুরপাক খেতে পারে? আমি ও পারলাম না, মনে হচ্ছিল সাইকেল চালানোটা একটা শাস্তি! হিসেব করে দেখলাম ,বাংলাদেশে ৭ টা রুটে ক্রস কান্ট্রি হয়েছে। একটাই বাকী ,সেটা এই সিলেটের সীমান্ত থেকে টেকনাফ গেলেই হয়ে যায়। সিলেটের রাহিক ভাই এর কাছে প্রস্তাব দিলাম। সেও লুফে নিলো! আমার সাইকেল ই সে চালাবে ,অনেকটা মাল গাড়ির আদলে! আর আমি রোড বাইক নিয়ে কোন ধরনের বোঝা বহন না করে উড়ে উড়ে যাবো। সেই মতেই একদিন প্র্যাকটিসের আদলে ক্রস কান্ট্রি করতে বেড়িয়ে পরলাম এই রুটে-
জকিগঞ্জ-বিয়ানীবাজার-শায়েস্তাগঞ্জ-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম-চকরিয়া-টেকনাফ।
এত জোরে সাইকেল জীবনে চালাই নি! কুমিল্লা চট্টগ্রামের হাইওয়েতে ওইদিন যারা মাল বোঝাই ট্রাক নিয়ে যাচ্ছিল তারা অনেক দিন মনে রাখবে আমাকে! গতির নেশায় একটার পর একটা ট্রাক অতিক্রম করেছিলাম শুধু। নতুন বছর ২০১৬ উদযাপন করলাম ট্রিপের মাঝেই।
২০১৬ এর জানুয়ারী।প্রথম সাইকেল নিয়ে বিদেশ যাত্রা। মালয়েশিয়ার একদম উত্তরে থাই বর্ডার থেকে ৪ দিনে ১০০০ কিলো পাড়ি দিয়ে এলাম সিংগাপুর। অবিশ্বাস্য ছিল সেই যাত্রা। অর্ধেকের বেশী পাহাড়ি পথ। বিভিন্ন দেশের ৬০ জন সাইক্লিস্টস। দেশের কুয়ার ব্যাং বিদেশী নদীতে পরলাম মনে হচ্ছিল! এর মাঝে একদিন চালাতে পারি শারীরিক অসুস্থতা হেতু। দ্বাদশ খেলোয়াড়ের মত পানি টেনে কাটানোটাও ছিল নতুন অভিজ্ঞতা! কিন্তু যেই ৩ দিন চালিয়েছি তাতে সিলেট- কক্সবাজারের ক্রস কান্ট্রি প্র্যাকটিসের অবদান ই বেশী। জয় হোক ক্রস কান্ট্রির!
দেশে ফেরার পর শুধুই অভিনন্দন আর অভিনন্দন!
২ মাস এ করেই কাটল।
২০১৬ এর এপ্রিলে বুঝলাম জং ধরছে সাইকেলে ,মনেও ।আবার বের হতে হবে। খুজে খুজে দেখলাম সারা বাংলাদেশে ৫ টি জেলায় আমি কোনদিন সাইকেল চালাইনি। আবার রিফাত কে নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম। সেই ৫ টি জেলায় চাকার ছাপ ফেলতে গিয়ে পাড়ি দিলাম ১০ দিনে ১৭ টি জেলা!
চৈত্র মাসের প্রখর রোদে খুব ধীরে ধীরে একে একে পাড়ি দিলাম-
ঢাকা থেকে-গাজীপুর-টাংগাইল-সিরাজগঞ্জ-বগুড়া-জয়পুরহাট-দিনাজপুর-নওগা-নাটোর-পাবনা-কুস্টিয়া-ঝিনাইদহ-মাগুরা-যশোর-নড়াইল-গোপালগঞ্জ-বরিশাল-ভোলা।
এই ট্রিপে আমার সাইকেল ই মালগাড়ী! রিফাত চালালো কোন ভার বহন ছাড়াই। দাতে দাত চেপে গরম সহ্য করে,প্রতিদিন ১০০ কিলোর মত করে চালিয়ে শেষ করলাম এই ভ্রমন।
ভোলায় এসে ছুয়ে ফেললাম ৬৪ জেলা।আমি পরিতৃপ্ত। ৪ বছর ধরে সাইকেলে। তাতে যেটা হয়েছে আমি সবচেয়ে বেশী উপজেলাও ঘুরেছি। অনেক ট্রিপে একই জেলা অভার ল্যাপ হয়েছে। সব গুলো জাতীয় মহাসড়ক তো চালিয়েছি ই।সাথে অসংখ্য প্রচলিত –অপ্রচলিত গ্রামীণ সড়ক। কোন রোড নেই জেনেও শুধু সামনে কি আছে দেখার নেশাও চলে গিয়েছি অনেক নতুন জায়গায়।ছুয়ে এসেছি প্রায় সব গুলো সীমান্ত স্থল বন্দর।
আমার মাথাটাই এখন একটা বাংলাদেশের ম্যাপ! জীবন্ত জিপিএস ও বলে অনেকে!
আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।আমাকে বাংলাদেশের প্রতিটা অঞ্চলের ভাষা, আচার, বৈচিত্র, খাবার, বৈশিষ্ট্য , সংস্কৃতি দেখার ও জানার সুযোগ করে দিয়েছেন ।
দিন শেষে সাইকেল এখন আমার কাছে একটা বাহন ই। কিন্তু তার মাধ্যমে দেশ ব্যাপী যেই বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী গুলো পেয়েছি তা অমুল্য। অন্য কোন মাধ্যম দিয়ে এতটা সহজে এসব সম্ভব হতো না।
দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে এখন স্বপ্ন দেখার সাহস করি ,অসীম পৃথিবীটা ঘুরে দেখার।সাইকেলেই!
জানি না আমার দ্বারা হবে কিনা। কিন্তু আমি না পারলে আরেক জন বাংলাদেশী হয়ত পারবে। পারতেই হবে। বাঙ্গালি এখন আর ভেতো বাঙ্গালি নয়। সবগুলো মহাদেশে বাংলাদেশী সাইকেল টুরার যাবেই ।
সাইকেল নিয়ে ঘুরে এই স্বপ্নের বীজটুকু অন্তত আমি বুনে দিতে চেস্টা করে গেছি সবার মাঝে।
আমার বিশ্বাস আমি সফল। প্রতিদিনই যখন অনেক মানুষ ফেসবুকে বা ফোনে বিভিন্ন অঞ্চলের রুট এর খোজ করে ,তারা সাইকেলেই সেখানে যেতে চায়। আমি আপ্লুত হই। তারা হয়ত ভাসা ভাসা উত্তর পেয়ে বিরক্ত ও হয়! কিন্তু আমার বিশ্বাস ওই হালকা ধারনার উপর ভর করেই তারা পথে নামে, নেমে নতুন পথের সন্ধান পায় । আর ও নতুন নতুন পথের সন্ধানে নামে। আর ও নতুন নিয়াজ রা তাতে সঙ্গী হয়।
এভাবেই হচ্ছে আমার স্বপ্ন পুরন।
ধৈর্য ধরে এতক্ষন এই সব এলোমেলো লিখা পরার জন্য অনেক অভিনন্দন! এটা থাকলেই আসলে শেষ পর্যন্ত যাওয়া যায়।
আমার এই লেখা আপাতত এখানেই শেষ। নতুন কোন ট্যুরের স্বপ্ন বোনা শুরু করি। দোয়া করবেন যেনো সফল হই।
জয় বাংলা।
জয় সাইকেল।।
নিয়াজ মোর্শেদ
১৯-০৪-২০১৬ ইং
ধানমন্ডি, ঢাকা।
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে...Share on Facebook
Facebook
Share on Google+
Google+
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin

Leave a Reply